জীবন নিয়ে আর কোনো স্বপ্ন দেখি না

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক মেহতাব খানম। তিনি আপনার মানসিক বিভিন্ন সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান দেবেন। অল্প কথায় আপনার সমস্যা তুলে ধরুন।—বি. স.

সমস্যা
জীবনে কী পেলাম আর কী পেলাম না, ৪৫ বয়সে এসে তা নিয়ে তেমন মাথা ঘামাই না। কিন্তু বছরের পর বছর বুকের ভেতর লালন করা একটা তীব্র ক্ষোভ, না পাওয়ার ব্যথা আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। অনেক আশা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু স্নাতক পড়া ছেড়ে, সাধারণ কলেজে পাস কোর্সে ভর্তি হতে হয়েছিল। বিয়ের পর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করি।

বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আমি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েও পড়তে না পারার ক্ষোভে জীবন নিয়ে আর কোনো স্বপ্ন দেখি না। নিজেকে ধরে রাখতে পারি না, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নেওয়া উঁচু পদে অধিষ্ঠিত পরিচিত কেউ সামনে এসে দাঁড়ান। মনে হয়, আমারও তো এ রকম একটা ডিগ্রি থাকতে পারত, তখন পরিচিতি হয়ে পড়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুক ব্যাচের অমুক বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে। কিন্তু কিছুই হলো না।

আমার এই বিষণ্নতা, না পাওয়ার বেদনা মাঝেমধ্যে অসহ্য হয়ে ওঠে। তার থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো পথ আছে?

নাম ও ঠিকানা প্রকাশে অনিচ্ছুক
পরামর্শ
তুমি লিখেছ, নিজেকে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করেছ বলে তোমার মনে হয়। এগুলো তোমাকে খুব যন্ত্রণা দিয়েছে তা বোঝা যাচ্ছে। তবে লেখাপড়ার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, সেটা সবচেয়ে বেশি পীড়াদায়ক তোমার জন্য। তবে স্নাতক পড়তে পড়তে তুমি কী কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কলেজে ভর্তি হয়ে পাস কোর্সে পড়লে, সেটি চিঠিতে উল্লেখ করোনি। নিশ্চয়ই এমন কোনো বিশেষ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল, যা তোমাকে বড় ধরনের একটি স্বপ্নপূরণের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করেছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ভর্তি হয়েছিলে জেনে মনে হচ্ছে, তুমি একজন অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী। হয়তোবা কারণটি এমনই ছিল, যা তোমাকে বাধ্য করেছে পাস কোর্সে ভর্তি হওয়ার জন্য। সেটি যে একটি খুব বড় ধরনের ধাক্কা ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে তুমি কিন্তু একেবারে থেমে যাওনি, বরং প্রতিকূলতাকে জয় করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে নিজেকে উপার্জনক্ষম করেছ। তোমার মতো মেধাসম্পন্ন, জ্ঞানী একবন মানুষের কাছে সেই অর্জনটি যে ম্লান মনে হবে, তা-ও স্বাভাবিক।

তোমার জীবনের অন্য বিষয়গুলো, যেমন ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রেক্ষাপট কেমন ছিল বা এখন রয়েছে, তা জানতে পারলে ভালো হতো। বেশির ভাগ সময় কোনো একটি ক্ষেত্রে আমরা কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে আমরা মানসিকভাবে ভালো থাকার প্রাণশক্তি পাই। এমন কি হয়েছে যে তুমি সেই জায়গাগুলো থেকে যথেষ্ট উৎসাহ ও সহযোগিতা পাওনি, যা তোমার কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে?

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ও পিএইচডি না করেও তুমি কিন্তু একটি সুন্দর মানুষ গড়ার জায়গাটিতে চমৎকার অবদান রাখতে পারছ। একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের মোক্ষম সময় হচ্ছে প্রথম সাত-আট বছর। সেই সময়ে যদি তারা সৎ ও আদর্শ শিক্ষকের সংস্পর্শে আসতে পারে, তাহলে দেশের সুনাগরিক পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কিন্তু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো পরিবর্তনের খুব সুযোগ থাকে না। তোমার এই বিষণ্নতা কবে শুরু হয়েছে জানি না, তবে এই অবস্থায় থাকলে তুমি শ্রেণিকক্ষকে আকর্ষণীয় করে তোলার আগ্রহ পাবে না। শিক্ষার্থীরাও কিন্তু একজন প্রাণবন্ত ও হাস্যোজ্জ্বল শিক্ষকের সঙ্গ উপভোগ করে।

তোমাকে আন্তরিকভাবে অনুরোধ করব, এখন থেকেই নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করো যে তুমি কখনো কারও সঙ্গে নিজেকে তুলনা করবে না। কারণ, আমরা সবাই নিজের মতো করেই অনন্য ও অসাধারণ। কেবল আমাদের তুলনা ও প্রতিযোগিতা নিজের সঙ্গেই হতে পারে। প্রতিদিনের চর্চায় আমরা নিজেকে কিছুটা সমৃদ্ধ করার সংকল্প গ্রহণ করব। তোমার জীবনের বিভিন্ন মোড়ে যেসব বাধা এসেছে, সেটি আর কারও সঙ্গে তুলনীয় নয়। কাজেই নিজেকে কারও সঙ্গে মেলাতে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে নিজের সত্তাকে অবমাননা করা। এ ছাড়া প্রতিদিন অল্প সময়ের জন্য হলেও শরীরচর্চা, মেডিটেশন, সৃষ্টিকর্তার কাছে আত্মসমর্পণ আমাদের অনেক শক্তি দেয়। ইউটিউবে মোটিভেশনাল বক্তৃতাগুলো নিয়মিত শুনলেও মানসিক উন্নয়ন ঘটে থাকে। এ ছাড়া তোমার ভাবনা ও আবেগগুলো লেখার মাধ্যমেও মনের ভার কিছুটা লাঘব হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *