এই উচ্চশিক্ষিত বেকার তরুণেরা যাবেন কোথায়?

গত সোমবার জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজীর প্রশ্নের উত্তরে জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ বছর করার কোনো পরিকল্পনা আপাতত সরকারের নেই। যুক্তি দেখানো হয়েছে, আগে বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের সেশনজট থাকলেও এখন নেই। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানো হলে বিভিন্ন পদের বিপরীতে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়ে যাবে। ফলে ৩০ বছরের কম বয়সী প্রার্থীদের মধ্যে হতাশা দেখা দেবে।

মন্ত্রী ৩০ বছরের কম বয়সীদের হতাশা দেখেছেন। কিন্তু ৩০ বছরের বেশি বয়সীদের বেদনা দেখেননি। অবসরের বয়স বাড়ানোর কারণে শূন্য পদের সংখ্যা কিছুটা কমলেও এখনো হাজার হাজার পদ শূন্য আছে। সেগুলো পূরণ করলে তরুণদের যেমন বেকারত্বের অভিশাপ বইতে হতো না, তেমনি একটি পদের বিপরীতে কয়েক হাজার প্রার্থীকে প্রতিযোগিতায় নামতে হতো না। আবার প্রশাসনের ওপরের দিকে পদ না থাকলেও অনেককে পদোন্নতি দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

মন্ত্রীর ওই যুক্তি যে অনেক মানুষ গ্রহণ করেনি, তার একটা ধারণা পাওয়া যায় পরদিন প্রথম আলোর পাঠক অনলাইন জরিপ থেকে। যদিও এ জরিপ পুরোপুরি বিজ্ঞানভিত্তিক নয়। প্রশ্ন রাখা হয়েছিল, ‘সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা আপাতত বাড়ছে না, সর্বোপরি এ সিদ্ধান্ত যৌক্তিক বলে মনে করেন কি?’ মোট ৪ হাজার ৬২৪ জন উত্তরদাতার মধ্যে ৭১ দশমিক ৩৫ শতাংশ বলেছেন ‘না’। ২৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ বলেছেন ‘হ্যঁা’। একই বিষয়ে প্রথম আলো চলতি বছর ৭ মে আরেকটি পাঠক জরিপ করে, যাতে প্রশ্ন ছিল, ‘চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছর করার দাবি সমর্থন করেন কি?’ ৭৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ বলেছেন, ‘হ্যাঁ’ এবং ২৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ বলেছেন, ‘না’।

যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারের কর্তব্য হলো জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং সেটি যদি হয় তরুণদের, তাহলে আরও
বেশি আমলে নেওয়া। সরকার দাবি করে তারা তরুণদের উন্নয়নে কাজ করছে, তাঁদের সমস্যা সমাধানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু চাকরিপ্রার্থী তরুণদের ক্ষেত্রে তার বিপরীত চিত্রই আমরা দেখতে পাচ্ছি।

সাধারণ ছাত্র পরিষদের ব্যানারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়া লাখ লাখ তরুণ কয়েক বছর ধরে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। এই তরুণেরা তাঁদের আরজি নিয়ে মন্ত্রী-সাংসদদের কাছে গেছেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধরনা দিয়েছেন, সারা দেশে সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছেন। কখনো কখনো পুলিশের লাঠিপেটা–টিয়ার গ্যাসও খেতে হয়েছে। তরুণদের একটিই দাবি, তাঁরা যেন অন্যদের মতো চাকরির দরখাস্তটি করতে পারেন। বয়স যেন বাধা না হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিযোগিতায় না টিকলে তাঁদের কিছু বলার নেই। অন্তত প্রতিযোগিতা করার সুযোগটি দেওয়া হোক।

স্মারকলিপিতে তাঁরা বলেছেন, ‘আমরা উচ্চশিক্ষিত তরুণসমাজ আজ সর্বোচ্চ শিক্ষা শেষে পরিবার, সমাজ ও দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে বোঝা হয়ে পড়ছি। কারণ, আমাদের অর্জিত বিদ্যা আইনের মারপ্যাঁচে সীমাবদ্ধ সুযোগের কাছে পরাজিত হচ্ছে। নানা প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে স্নাতক শেষে অর্জিত বিদ্যা দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজে লাগানোর আগে স্বপ্নিল ভোর অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছরে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে। …আইন প্রণয়নের মাধ্যমে আপনারাই দেশের ভবিষ্যতের কল্যাণ নির্ধারণ করে থাকেন। আইনকে যুগোপযোগী রাখার জন্য সময়ে-সময়ে এর পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন করার প্রয়োজন পড়ে। সময়ের আলোকে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা এমনই একটি আইন, যা এখন পরিবর্তনের মাধ্যমে ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ বছরে উন্নীত করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।’

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৫ বছরে উন্নীত করার পক্ষে তাঁদের যুক্তি হলো স্নাতক ও সম্মান উভয় ক্ষেত্রে লেখাপড়ার সময় ১ বছর করে বাড়িয়ে যথাক্রমে ৩ ও ৪ বছর করা হয়েছে; চিকিৎসকদের চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর করা হয়েছিল এই বলে যে তাঁদের সাধারণদের চেয়ে ১ বছর অর্থাৎ ৪ বছর অধ্যয়ন করতে হয়। পরবর্তী সময়ে সাধারণের স্নাতক ও সম্মান উভয় পর্যায়ে সময় ১ বছর বৃদ্ধি করা হলেও চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা আনুপাতিক হারে বাড়ানো হয়নি। নিয়মানুযায়ী ২৩ বছর বয়সে শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সমীকরণটি শুধু কাগজ-কলমের মধ্যে সীমাবদ্ধ; তার প্রমাণ ২৭-২৮ বছরের আগে কোনো ছাত্রের শিক্ষাজীবন শেষ না হওয়া।

তাঁরা আরও বলেছেন, সরকারি নিয়ম অনুসরণের কারণে বেসরকারি ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও ৩০ বছরের ওপরের জনবল (অভিজ্ঞতা ছাড়া) নিয়োগ দেয় না। ফলে বেসরকারি ক্ষেত্রেও কাজের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বয়সের সীমারেখা নির্দিষ্ট করা নেই। কোনো কোনো দেশে অবসরের আগের দিন পর্যন্ত চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ আছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৪০, বিভিন্ন রাজ্যে বয়সসীমা ৩৮ থেকে ৪০ বছর, শ্রীলঙ্কায় ৪৫, ইন্দোনেশিয়ায় ৩৫, ইতালিতে ৩৫ বছর, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৩৮, ফ্রান্সে ৪০, ফিলিপাইন, তুরস্ক ও সুইডেনে যথাক্রমে সর্বনিম্ন ১৮, ১৮ ও ১৬ এবং সর্বোচ্চ অবসরের আগের দিন পর্যন্ত, দক্ষিণ আফ্রিকায়ও চাকরিপ্রার্থীদের বয়স সীমাবদ্ধ নয়। চাকরিপ্রার্থীদের বয়স ২১ হলে এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে যেকোনো বয়সে আবেদন করতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল ও রাজ্য সরকারের চাকরিতে প্রবেশের বয়স কমপক্ষে ২০ বছর, আর সর্বোচ্চ ৫৯ বছর। কানাডার ফেডারেল পাবলিক সার্ভিসের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০ বছর হতে হবে, তবে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে নয় এবং সিভিল সার্ভিসে সর্বনিম্ন ২০ বছর এবং সর্বোচ্চ ৬০ বছর পর্যন্ত সরকারি চাকরিতে আবেদন করা যায়।

সাধারণ ছাত্র পরিষদের যুক্তি, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর সঙ্গে সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লেষ নেই। এ জন্য সরকারকে একটি বাড়তি পয়সাও খরচ করতে হবে না। বরং এতে উপকৃত হবেন লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ-তরুণী ও তাঁদের পরিবার।

মন্ত্রী সংসদে উচ্চশিক্ষালয়ে সেশনজট কমেছে বলে জানিয়েছেন। কিন্তু এরপরও সাধারণ ছাত্র পরিষদ যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, তা উদ্বেগজনক। আর এই তরুণদের অনেকে তিন–চার বছর আগে পাস করে বেরিয়েছেন, যখন মন্ত্রীর ভাষায় ‘বড় ধরনের সেশনজট’ ছিল। অতএব, তাঁরা তো ন্যায়সংগতভাবেই বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি জানাতে পারেন। অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো সেশনজট আছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৬ বছরের সেশনজটের চিত্র এ রকম:

২০০৮ সালের মাস্টার্স পরীক্ষায় সেশনজট ছিল ২ বছর ১১ মাস ৮ দিন। ২০০৯ সালে ৩ বছর ১ মাস ৬ দিন। ২০১০ সালে ৩ বছর ১২ দিন। ২০১১ সালে ২ বছর ১১ মাস ১০ দিন। ২০১২ সালে ২ বছর ১১ মাস ২৭ দিন। ২০১৩ সালে ২ বছর ৯ মাস ৮ দিন।

২০১৪ সালের মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ হয়েছে চলতি বছরের জুলাই মাসে। আর ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালের মাস্টার্স পরীক্ষার তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।

ঢাকার আটটি সরকারি কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নিয়ে যাওয়ার ফলে আরেক দফা সেশনজটের মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট কলেজের কয়েক লাখ শিক্ষার্থী। পরীক্ষার দাবিতে তাঁরা রাজপথে মিছিলও করেছেন। পুলিশের টিয়ার গ্যাসে সিদ্দিকুর রহমান নামে তিতুমীর কলেজের এক শিক্ষার্থী চোখ হারিয়েছেন। তারপরও সমস্যার সমাধান হয়নি। জাতীয় বনাম ঢাকার দ্বৈরথ চলছে।

এই স্মারকলিপিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এবং পাস করে যাওয়া ডজন দুই তরুণ-তরুণীর নাম দেওয়া আছে। আমরা
কারও নাম উল্লেখ করলাম না। আমরা শুধু বিষয়টি বিবেচনার দাবি জানাচ্ছি এ কারণে যে এই লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত তরুণ কোথায় যাবেন?

সাধারণ ছাত্র পরিষদের যে নেতারা দীর্ঘদিন ধরে চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানোর জন্য আন্দোলন করে আসছেন, তাঁদের প্রতিনিধিরা বেশ কয়েকবার প্রথম আলো অফিসে এসে দাবিদাওয়ার কথা জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবারও এই তরুণদের একটি দল এসে একই দাবির পুনরাবৃত্তি করলেন। তাঁদের শেষ ভরসা ছিল, জাতীয় সংসদ তাঁদের কিছু একটা করবে। একাধিক সাংসদ সে রকম আশ্বাসও তঁাদের দিয়েছিলেন। কিন্তু যেদিন জনপ্রশাসনমন্ত্রী প্রশ্নোত্তরে জানিয়ে দিলেন বয়সসীমা বাড়ানোর পরিকল্পনা আপাতত নেই; সেদিন এই তরুণেরা খুবই হতাশ হয়ে পড়লেন। এখন তাঁরা মনে করেন, পত্রিকায় লেখালেখি হলে হয়তো সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে।

আমরা এই তরুণদের চোখে–মুখে গভীর হতাশা ও বেদনার ছাপ দেখেছি। তাঁরা কোথায় যাবেন এখন? ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। পড়াশোনা শেষ হওয়ায় বাবা-মায়ের কাছে টাকা চাইতে পারেন না। বেকার বলে বন্ধুবান্ধবের কাছে মুখ দেখাতে পারেন না।

সহকর্মী মশিউল আলম অনেক আগে এক কলামে লিখেছিলেন, চাকরি না পাওয়ার কারণে এক তরুণ তাঁর প্রেমিকাকে হারিয়েছেন, যঁার সঙ্গে তাঁর বিয়ের কথা পাকা হয়েছিল। বেকারত্বের কারণ এ রকম প্রেমিকা হারানো কিংবা বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ঢের উদাহরণ আছে।

প্রথম আলো অফিসে আসা তরুণেরা ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘আমরা সরকারের কাছে চাকরি চাই না। চাকরি আমরা নিজেদের যোগ্যতায়ই পেতে চাই। সরকার শুধু বয়সের খাঁড়াটি তুলে নিক। আমাদের একটি দরখাস্ত করার সুযোগ দিক।’

বাংলাদেশে লাখ লাখ তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে এভাবে বসে আছেন। কিন্তু বয়সের কারণে দরখাস্ত করতে পারছেন না।

সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছে। মধ্যম আয়ের দেশের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু এই উচ্চশিক্ষিত তরুণদের উন্নয়নপ্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়ে সেটি কীভাবে সম্ভব? এই মুহূর্তে সরকারের কাছে লাখ লাখ তরুণের পক্ষ থেকে একটি দাবিই পেশ করছি, অন্যান্য দেশের মতো চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা শিথিল করা হোক। তাঁদেরও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক।

যে তরুণদের পেছনে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে, অভিভাবকদের কেউ ধারকর্জ করেছেন, কেউ জমি বন্ধক রেখেছেন, সেই তরুণদের বিষণ্ন-বিপন্ন মুখ আমরা দেখতে চাই না। রাষ্ট্র কোনোভাবেই তাঁদের অবাঞ্ছিত বা অপাঙ্‌ক্তেয় ঘোষণা করতে পারে না। সরকার অন্তত মানবিক কারণে তাঁদের আরজিটি বিবেচনা করুক।

আমরা তরুণদের বলেছি, প্রতিবছর হাজার হাজার তরুণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছেন। সরকার কতজনকে চাকরি দিতে পারবে? আপনারা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির চেষ্টা করুন। জবাবে তাঁরা বললেন, সরকার যেহেতু ৩০ বছর বয়সসীমা বেঁধে দিয়েছে, সেহেতু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও সেটি অনুসরণ করছে। ৩০ বছর বয়সের পর তারাও দরখাস্ত নেয় না।

এত বিপুলসংখ্যক তরুণের জীবন তো ধ্বংস হতে পারে না। নিশ্চয়ই সরকারের কিছু করণীয় আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *